ইতিকাফ কি ইতিকাফের প্রকারভেদ সঠিক ভাবে ইতিকাফ করার নিয়ম আমল ও ফজিলত

1
61


ইতিকাফ কি

রমজানুল মোবারকের শেষ দশকের উৎকৃষ্ট আমল গুলোর একটি হলো ই’তিকাফ। ই’তিকাফের উদ্দেশ্য দুনিয়ার সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে, শুধু আল্লাহর ধ্যানে তার দরবারে বসে থাকা এবং সর্বদা তার জিকিররত থাকা।
আল্লাহর মনোনীত বান্দাদের এ এক বিশেষ বিশেষ এবাদত।

কোরআন নাজিল হওয়ার আগে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দিনের-পর-দিন মাসের-পর-মাস হেরা গুহায় নির্জনতা অবলম্বন করতেন।

বস্তুত; এ ছিল তার প্রথম সময়কার ই’তিকাফ। এর ফলে তিনি আধ্যাত্মিকতার শেষ স্তরে পৌঁছান, সেখানে পৌঁছার পর তার ওপর কোরআন নাজিল হয়। রমজানের পুরো মাসটি হলো মানুষের পশুবৃত্তিকে দমন করে আত্মার উন্নতি সাধন করার অপূর্ব সুযোগ। এ মাসে হারাম কাজ ত্যাগ করার কঠিন নির্দেশ তো আছেই, এমনকি রোজা অবস্থায় অনেক হালাল কাজও ত্যাগ করতে হয়। তারপর আবার আল্লাহর আল্লাহর সাথে আরো বেশি সম্পর্ক স্থাপনের জন্য ই’তিকাফের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মুমিন বান্দা দুনিয়ার সকল ঝামেলা ত্যাগ করে মসজিদের কোনে শুধু তসবি পাঠ করতে থাকে এবং ক্ষণে ক্ষণে নিজের সকল অপরাধের মার্জনার উদ্দেশ্যে তওবা ইস্তেগফার করতে থাকে। রাতের অন্ধকারে নির্জনে ওঠে চোখের জলে নিজের ‌ বুক ভাসায়। এজন্যই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানের শেষ দশকে ই’তিকাফে বসতে অসমর্থ হলে, পরবর্তী বছর মোট ২০ দিনের ই’তিকাফে বসতেন।
[img id=7425]


ই’তিকাফ ৩টি প্রকারভেদ আছে

ওয়াজিব ই’তিকাফ

মান্নত করলে ই’তিকাফ ওয়াজিব হয়, চাই সে মান্নত শর্তযুক্ত হোক বা শর্তহীন। ওয়াজিব ই’তিকাফের জন্য রোজা রাখা শর্ত।


সুন্নতে মুয়াক্কাদা আলাল কেফায়া ই’তিকাফ

রমজানের শেষ দশকে ই’তিকাফ করা সুন্নত সুন্নতে মুয়াক্কাদা আলাল কেফায়া। অর্থাৎ মহল্লার কেউ ই’তিকাফ না বসলে সকালে গুনাগার হবে


মুস্তাহাব ই’তিকাফ

রমজানের শেষ দশক ছাড়া যে কোন সময় ই’তিকাফ নেওয়া মুস্তাহাব, তবে ই’তিকাফের জন্য রোজা সত্য নয়।


ই’তিকাফের ফজিলত

হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহা বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানের শেষ দশকে ই’তিকাফ করতেন। ইন্তেকাল পর্যন্ত তার এই আমল অব্যাহত ছিল। ইন্তেকালের পর তাঁর স্ত্রীগণও গুরুত্বের সাথে ই’তিকাফের আমল করতেন।

আরো একটি হাদীসে আছে, যে ব্যক্তি মাহে রমজানের (শেষ) দশ দিন ই’তিকাফ করবে, তার এই আমল (সওয়াবের ক্ষেত্রে) দুই হজ্ব ও ওমরাহ সমতুল্য হবে।

অপর এক হাদীসে আছে, যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের নিয়তে ই’তিকাফের আমল করবে, তার অতীত গুনা ক্ষমা করে দেয়া হবে।


ই’তিকাফের আহকাম ও ৩টি মাসায়েল

১।পুরুষের জন্য মসজিদে। চাইছে মসজিদে জুমআ হোক বা না হোক, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নিয়মিত আদায় করা যাক বা না যাক।
সবচেয়ে উত্তম ই’তিকাফ হলো মসজিদুল হারামে। এরপর মসজিদে নববীতে। এরপর মসজিদুল আকসায়। ততপর যেখানে মুসল্লিদের সমাগম বেশি হয়।

২। ই’তিকাফের নিয়তে অবস্থান করা

৩। হায়েজ-নেফাছ অথবা গোসল ফরজ হওয়া অবস্থা থেকে পবিত্র থাকা।

ওয়াজিব ই’তিকাফ কমপক্ষে একদিন দীর্ঘ হতে হয়। সুন্নাতে মুয়াক্কাদা ই’তিকাফ দশ দিনের কম হয় না। অবশ্য ২৯ তারিখ চাঁদ দেখা গেলে ভিন্ন কথা। আর মুস্তাহাব ই’তিকাফ এর জন্য সময় নির্দিষ্ট নেই। এক মিনিটের জন্য এই ই’তিকাফের আমল করা যায়। মাহে রমজানের শেষ দশকে ই’তিকাফ নিতে হলে মাহে রমজানের ২০ তারিখের সূর্যাস্তের আগে মসজিদে বসে তো হবে এবং ঈদের চাঁদ দেখা যাওয়ার পর বের হতে হবে।

[img id=7426]


ই’তিকাফ অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজ

শারীরিক প্রয়োজন তথা প্রস্রাব পায়খানা ও জানাবাতের গোসল এবং শরীয়তের প্রয়োজন যেমন, জুম’আর নামাজ আদায়ের জন্য জামে মসজিদে গমন ছাড়া ই’তিকাফের স্থান ত্যাগ করা। স্ত্রী সঙ্গম, তা ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়। উপরোক্ত নিষিদ্ধ কাজ করলে।

কোন কারনে ই’তিকাফ ভঙ্গ হলে তার কাজা আদায় করতে হবে। রমজানের ই’তিকাফের কাজা দিতে রমজান অবশ্যক নয়। তবে রোজা থাকা অবশ্যক। মুস্তাহাব ই’তিকাফের কাজা দিতে হয় না। ই’তিকাফের অবস্থায় যৌন উন্মাদনায় বীর্যপাত হলে ই’তিকাফ ভঙ্গ হয় না।

ই’তিকাফকারীকে শারীরিক অথবা শরয়ী যেকোনো ধরনের প্রয়োজন পূরণের সাথে সাথে মসজিদে প্রবেশ করতে হবে। খাবার আনার জন্য কেউ না থাকলে নিজে গিয়ে খাবার নিয়ে আসতে পারবে। তবে এতে অধিক সময় বিলম্ব করার করা যাবে না। জুম’আর গোসল কিংবা শীতলতা লাভের মানসে গোসল করার জন্য বাহিরে যাওয়া বৈধ নয়। বের হলে ই’তিকাফ ভঙ্গ হবে। তবে হ্যাঁ যদি গোসল না করলে শরীর একেবারে খারাপ হয়ে যায়, তখন অল্প সময়ের মধ্যে গোসল করা যেতে পারে। এতে ই’তিকাফ ভঙ্গ হবে না। মসজিদের ভিতরে ওযু গোসলের ব্যবস্থা থাকলে বের হওয়া যাবে না। তবে এই ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে, যাতে গোসলের পানি মসজিদে না পড়ে। আর আযান দেওয়ার জন্য মসজিদের বাহিরে যাওয়া জায়েজ আছে।

উপরোক্ত শরয়ী ও শারীরিক প্রয়োজন ছাড়া ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় মসজিদ থেকে বের হলে ইমাম আবু হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি মতে ই’তিকাফ ভঙ্গ হয়ে যাবে।

কোন মুমূর্ষ রোগীর সাথে সাক্ষাৎ বা পানিতে ডুবন্ত মানুষকে বাঁচানোর জন্য কিংবা আগুনে নির্বাপনের জন্য বা অন্য কোন প্রয়োজনে বের হলে ই’তিকাফ ভঙ্গ হবে। তবে শরীয়ত সম্মত প্রয়োজন পূরণে বের হলে চলার পথে রোগীর সাথে সাক্ষাত হলে বা জানাযায় অংশগ্রহণ করা জায়েজ আছে।

মসজিদে হুক্কা বা বিড়ি সিগারেট খাওয়া জায়েজ নেই। তাই এই উদ্দেশ্যে মসজিদ থেকে বের হওয়াও জায়েজ নেই। এইসব কাজে অভ্যস্ত লোকদের জন্য উচিত যে, তারা যেন ই’তিকাফের সময় হল এই সব কাজ থেকে বিরত থাকে। ই’তিকাফ কালে পরনিন্দা মিথ্যা অপবাদ ও অনর্থক কথাবার্তা এবং গল্প গুজব-গুজব হতে বিরত থাকবে। এই ধরনের মারাত্মক পাপের কাজ গুলো থেকে বিরত থেকে বিভিন্ন ধরনের ইবাদত-বন্দেগিতে নিয়োজিত থাকা একান্ত জরুরী। তাসবিহ তাহলিল সহ অন্যান্য ও জিকির-আজকারে মগ্ন থাকবে। যেহেতু ই’তিকাফ অবস্থায় বিশেষ কোন ইবাদত নেই।


জরুরী জ্ঞাতব্য বিষয়

ই’তিকাফ কালে মসজিদের আদব ও সম্মান এর প্রতি নজর রাখা একান্ত জরুরী। মসজিদের আদব সংক্রান্ত বিষয়ে আগে থেকে জেনে নেওয়া উচিত। প্রধান আদব হলো, মসজিদের পবিত্র তার প্রতি বিশেষ যত্নবান থাকা। মসজিদ আল্লাহর ঘর। তাই এই ঘরের সম্মান করা অপরিহার্য। মসজিদে দুর্গন্ধযুক্ত কিছু রাখা বা অপরিচ্ছন্ন করা ফেরেশতাদের জন্য পীড়াদায়ক। এতে অন্য মুসল্লিদের কষ্ট হয়, যা সম্পূর্ণরূপে হারাম।

আরেকটি বিষয় হলো অনেকেই ই’তিকাফের অবস্থায় বিভিন্ন ধরনের গল্প-গুজব করে সময় নষ্ট করে থাকে।রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেন’ এমন এক যুগ আসবে যখন লোকেরা মসজিদে দুনিয়াবী কথা বার্তায় লিপ্ত হবে। তোমাদের কর্তব্য হলো তাদের পাশে না বসা। এই শ্রেণীর লোকের সাথে আল্লাহর কোন সম্পর্ক নেই।

তথ্যসুত্রঃ
আল্লামা জুনাইদ বাবুনগরী
শাইখুল হাদীস ও সহযোগী পরিচালক:
আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী।

1 COMMENT